মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত ভোলার চর কুকরি-মুকরি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের কারণে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ইকোট্যুরিজম গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, চিত্রা হরিণ, শীতের অতিথি পাখি, নদী, খাল ও সমুদ্রঘেঁষা নয়নাভিরাম পরিবেশ প্রতিবছর হাজারো পর্যটককে আকর্ষণ করলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে এই অপার সম্ভাবনা।
১৯৭৩ সালে বন বিভাগের উদ্যোগে চর কুকরি-মুকরিতে প্রথম বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে এর মোট আয়তন প্রায় ৮,৫৯৯ হেক্টর, যার মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ৮,০০০ একর, যা সুন্দরবনের পর বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম। ১৯৮১ সালের ১৭ ডিসেম্বর সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এর ৩,৯২২ হেক্টর এলাকাকে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর আওতায় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, বর্তমানে এই বনাঞ্চলে প্রায় ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত হরিণের সংখ্যা বনের স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা এবং উদ্ভিদ প্রজাতির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি শীত মৌসুমে এখানে ৪০টিরও বেশি প্রজাতির অতিথি পাখির দেখা মেলে। দ্বীপটি বিলুপ্তপ্রায় কালিম পাখি, মদনটাক, উদবিড়াল এবং মেছোবিড়ালের মতো প্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত।
পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় স্থান হলো নারিকেল বাগান সমুদ্রসৈকত। নিরিবিলি পরিবেশের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এটি ক্যাম্পিংপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে চর কুকরি-মুকরি পৌঁছানোর যাতায়াত ব্যবস্থা পর্যটকদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বা ভোলা সদর থেকে চরফ্যাশন হয়ে কচ্ছপিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর দ্বীপটিতে যেতে একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা স্পিডবোট। এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থানীয় কিছু অসাধু সিন্ডিকেটের অশুভ প্রভাব ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যটক এলাকাটি ভ্রমণ করেন। কিন্তু পর্যটন মৌসুমে আবাসন সংকট এখানে ভয়াবহ রূপ নেয়। বনবিভাগের ডাকবাংলো ও কয়েকটি বেসরকারি রিসোর্ট মিলিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫০ থেকে ২০০ জন পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই সৈকতে তাঁবু খাটিয়ে রাত যাপন করেন, তবে পর্যাপ্ত টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা না থাকায় সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ২৬ জুন বন বিভাগের বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় চর কুকরি-মুকরি ইকোপার্ক। কিন্তু উদ্বোধনের অল্প সময়ের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট বাজেট ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে পার্কের বিভিন্ন স্থাপনা ছনগাছ ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে ঢেকে গেছে। এর বাইরে পুরো দ্বীপে মোবাইল নেটওয়ার্কের কাভারেজ অত্যন্ত দুর্বল শুধুমাত্র গ্রামিণ ফোন ব্যতীত অন্য কোন অপারেটরের মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক এখানে কাজ করে না বললেই চলে। বিশেষ করে নারিকেল বাগান সৈকত ও বনাঞ্চলের গভীর অংশে প্রধান প্রধান অপারেটরগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে আসা ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
মাঠপর্যায়ে এসে বহু পর্যটক ও ব্যবসায়ী তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারজানা জানান, বর্ষাকালে কুকরি-মুকরির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে কয়েকটি ঘাটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিতে হয়েছে। এসব সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে সাধারণ পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন। রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক হুমায়রা মল্লিকা অদিতি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের জন্য মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে নেপাল থেকে আসা পর্যটক এমরাজ দ্বীতাল ও সিবাকর দেব চৌধুরি জানান, জায়গাটি অত্যন্ত সুন্দর হলেও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় দ্রুত উন্নয়ন প্রয়োজন, অন্যথায় বিদেশি পর্যটকদের দ্বিতীয়বার আসার আগ্রহ কমে যাবে। সিলেট থেকে আসা পর্যটক মো. ইজাজুর রহমান জানান, দুই দিন অবস্থানকালে পরিবারের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগই করতে পারেননি তিনি এবং অফ-সিজনে খাবার ও যাতায়াত নিয়েও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
নারিকেল বাগান সৈকতসংলগ্ন ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সুনির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সুপেয় পানির সংকট না মেটালে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা বেশি সময় অবস্থান করতে চান না।
বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন, প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই টেকসই ইকোট্যুরিজমের মূল ভিত্তি। ইউএনডিপির ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর ড. মোজান্মেল হক বলেন, এই সংবেদনশীল ইকোসিস্টেমে বড় কংক্রিটের স্থাপনা না গড়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীনির্ভর আবাসন ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বনের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রেখে পর্যটক পরিচালনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য নিষ্কাশনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমিন মনে করেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এখানকার ইকোট্যুরিজম স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও উপকূলীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ভোলা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডা. শামীম রহমান বলেন পর্যটকদের অভিযোগের সত্যতা কিছুটা স্বীকার করেছে জেলা প্রশাসন। তাদের দাবি, চর কুকরি-মুকরিকে পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয়ে কাজ চলছে। অর্থ বরাদ্দ পেলে সমস্যাগুলোর যথাপযুক্ত সমাধান করা হবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মাস্টারপ্ল্যানে চর কুকরি-মুকরিকে ‘এক্সক্লুসিভ টেকসই পর্যটন অঞ্চল’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ এখনো ধীরগতির। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নৌপথে বিআইডব্লিউটিএ-এর নির্ধারিত ভাড়ায় নিরাপদ সি-ট্রাক চালু করা, সৈকত এলাকাকে প্লাস্টিক-মুক্ত ঘোষণা করে বর্জ্য নিষ্কাশন কমিটি গঠন করা, জরুরি যোগাযোগের জন্য স্থায়ী নেটওয়ার্ক টাওয়ার স্থাপন এবং স্থানীয়দের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ‘হোমস্টে’ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসম্মত পর্যটনসেবা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে চর কুকরি-মুকরি দেশের অন্যতম মডেল ইকোট্যুরিজম গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।









